শহরের এক কোণে
কাঁচ আর ইস্পাতের এক বিশাল বিল্ডিং, নাম তার 'আল-মিজান
করপোরেট'। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এক স্থবির
প্রস্তরখণ্ড, কিন্তু ভেতরে কান পাতলে শোনা যায় হাজারো
দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। সেখানে প্রতিটি ডেস্কের ওপর জমে থাকতো অদৃশ্য কুয়াশা।
সেই অরণ্যের
একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন এইচআর ম্যানেজার জনাব আসলাম। তার হাসি ছিল শরতের মেঘের মতো
মোহনীয়, কিন্তু তার কলমের নিচে লুকানো ছিল এক বিষাক্ত লতা। আসলাম সাহেব যখন
কাউকে পছন্দ করতেন, তখন সেই কর্মীর ডেস্কে রাতারাতি ফুটে উঠতো নীল
পদ্ম—বিনা পরিশ্রমে প্রমোশন, অকাল বোনাস আর অফুরন্ত সুবিধা। আর যারা
তার চোখের বালি ছিল, তাদের ঘামের গন্ধে আসলাম সাহেবের নাকে দুর্গন্ধ
আসতো। প্রতিষ্ঠানের নিয়মগুলো সেখানে মোমের মতো গলে যেত আসলাম সাহেবের ব্যক্তিগত
মর্জির তাপে।
একদিন আসলাম
সাহেবের সেই অনৈতিক সাম্রাজ্যের দেয়াল ভেঙে পড়ল। সত্যের এক প্রবল ঝড়ে তার সিংহাসন
ধুলোয় মিশে গেল। তার স্থলাভিষিক্ত হলেন জনাব ইমতিয়াজ।
ইমতিয়াজ সাহেব
যখন অফিসে ঢুকলেন, তার চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল কস্তুরীর সুবাস।
তার দুচোখে ছিল ইনসাফের দীপ্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি কর্মী
এক একটি পবিত্র আমানত। তিনি আসলাম সাহেবের সেই 'নীল পদ্ম'
চাষ
বন্ধ করে দিলেন। নিয়ম হলো—কেবল যোগ্যতাই হবে সাফল্যের একমাত্র সিঁড়ি।
কিন্তু এখানেই
শুরু হলো এক অদ্ভুত জাদুকরী সংকট।
যাদের ডেস্কে
আগে বিনা মেঘে বৃষ্টি নামতো, অর্থাৎ যারা আসলাম সাহেবের আশীর্বাদে
অন্যায় সুবিধা পেত, তাদের মনগুলো হঠাৎ মরুভূমি হয়ে গেল। তাদের
অভিযোগের মেঘে আকাশ কালো হয়ে উঠলো। তারা ফিসফিস করে বলতে লাগল, "নতুন
ম্যানেজার তো আমাদের নাড়াচড়া করার জায়গাটাই কেড়ে নিলেন।"
অন্যদিকে,
যারা
ভাবত নতুন ম্যানেজার এলে তাদের ঝুড়ি উপচে পড়বে সওয়াব আর সুবিধায়, তারা
দেখল ইমতিয়াজ সাহেব কেবল মাপকাঠি নিয়ে বসে আছেন। তিনি কাউকে বাড়তি দিচ্ছেন না,
আবার
কারও হক মারছেন না। যারা শুধু সুবিধার আশায় হাত পেতে ছিল, তারা হতাশ হলো।
তাদের চোখে ইমতিয়াজ সাহেব হয়ে উঠলেন এক রূঢ় পাহাড়, যার গায়ে লেগে
স্বপ্নেরা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
অফিসের করিডোরে
এখন দুই ধরণের দীর্ঘশ্বাস। একদল হারানো সাম্রাজ্যের শোকে কাতর, অন্যদল
না-পাওয়া সুবিধার রাগে অন্ধ।
ইমতিয়াজ সাহেব
তার কক্ষে বসে জানালার বাইরে তাকালে দেখতেন, আকাশের মেঘেরা
যেন একেকটা অভিযোগের চিঠির মতো ভাসছে। তিনি বুঝলেন, অনৈতিকতার বিষ
একবার শিকড়ে ঢুকলে, শুদ্ধ জল দিলেও বৃক্ষটি প্রথমে বিদ্রোহ করে।
প্রতিষ্ঠানের নৈতিক আয়নাটি এতকাল ধুলোয় ঢাকা ছিল যে, এখন স্বচ্ছ
প্রতিবিম্ব দেখে সবাই ভয় পাচ্ছে।
একদিন বিকেলে
ইমতিয়াজ সাহেব সকল কর্মীকে ডাকলেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল বয়ে যাওয়া ঝরনার মতো স্নিগ্ধ।
তিনি বললেন, "ভাইসব, একটি প্রতিষ্ঠান কেবল ইট-পাথরের খাঁচা
নয়, এটি আমাদের রুটি-রুজির একটি বাগান। আমরা যদি আগাছাকে সার দিয়ে লালন
করি, তবে একদিন মূল গাছটিই মরে যাবে। আমি আপনাদের হাত ভর্তি উপহার দিতে
আসিনি, আমি এসেছি আপনাদের প্রত্যেকের শ্রমের ন্যায্য ওজন দিতে।"
সেদিন অফিসে এক
অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। ইমতিয়াজ সাহেবের টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসের পানি হঠাৎ
রুপোলি আলোর মতো জ্বলতে শুরু করল। কর্মীরা দেখল, তাদের
প্রত্যেকের কপালের ঘাম থেকে ছোট ছোট মুক্তো ঝরে পড়ছে মেঝের ওপর। যারা ফাঁকি দিয়ে
সুবিধা নিতে চেয়েছিল, তাদের মুক্তোগুলো কালো হয়ে মিলিয়ে গেল। আর যারা
নিরবে ঘাম ঝরিয়েছিল, তাদের মুক্তোগুলো আলোকিত করল পুরো কক্ষ।
এটিই ছিল তকদির
আর তকসিরের লড়াই। ইমতিয়াজ সাহেব মেকি হাসির বদলে ফিরিয়ে আনতে চাইলেন অন্তরের
প্রশান্তি। তিনি চাইলেন 'আল-মিজান' তার নামের মতোই
এক তুলাদণ্ড হয়ে উঠুক।
ধীরে ধীরে সেই
বিশৃঙ্খলা শান্ত হয়ে এল। যারা এতদিন অন্যের হক মেরে বড় হতে চেয়েছিল, তারা
বুঝতে পারল—অন্যায্য প্রাপ্তি হলো এমন এক নোনা জল যা তৃষ্ণা মেটায় না, বরং
কলিজা পুড়িয়ে দেয়। আর যারা অভিযোগ করছিল, তারা অনুভব করল যে স্বচ্ছতা ও মর্যাদাই
হলো একজন মানুষের আসল অলংকার।
গল্পের শেষে
কোনো জয়ধ্বনি ছিল না, ছিল এক গভীর নীরবতা। আল-মিজান করপোরেটের সেই
বিশাল অরণ্যে এখন আর অদৃশ্য কুয়াশা নেই। সেখানে এখন ভোরের প্রথম আলোর মতো এক
স্বচ্ছ নৈতিকতা খেলা করে। ইমতিয়াজ সাহেব সন্ধ্যাবেলায় যখন অফিস থেকে বের হন,
তখন
আকাশের নক্ষত্রগুলো যেন তার কপালে অদৃশ্য এক দোয়ার চাদর বিছিয়ে দেয়।
প্রতিষ্ঠানের বিবেক জেগে উঠেছে। যন্ত্রকে সচল রাখতে তেলের প্রয়োজন হয় সত্য, কিন্তু মানুষকে সচল রাখতে প্রয়োজন হয় হৃদয়ের শ্রদ্ধা আর ইনসাফের জ্বালানি। শহরের সেই বিশাল কাঁচের প্রাসাদে এখন মানুষগুলো আর রোবট নয়, তারা একেকটি জীবন্ত প্রাণ।


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।